ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান খান: (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার আশরাফুল আলম সবুজ করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ৫ দিন ধরে হোম কোয়ারান্টাইনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যিনি একজন করোনা যোদ্ধা হিসাবে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন একটানা। নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন করোনা পরিস্থিতির সেই শুরু থেকেই আজ তিনি করোনায় আক্রান্ত। তিনি হোম কোয়ারান্টাইনে থেকে তার ফেসবুকে একটি আবেকঘন স্ট্যাটাস শেয়ার করেছেন যা হুবুহু তুলে ধরা হলঃ

“আজ লালখানের আকাশে রোদ উঠেছে। ঠিক যেন, পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘ক্রেমলিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ এর মতই।এখানকার একটা বিল্ডিং এর তিন তলায় আমি আজ ৫ দিন হলো নিঃসঙ্গ আছি। কারো সাথে দেখা করা বারণ। আমার নাকি শরীরের শিরায় উপশিরায় মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস খেলা করছে।

এনিয়ে আমার পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী সকলেই মারাত্মক চিন্তিত। কিন্তু আমি মোটেও বিচলিত নই। কারন, আমি বিশ্বাস করি, আমার শরীরে বসবাস করে, আমার রক্ত মাংস খেয়ে বেঁচে থেকে সে আমার ক্ষতি করবে না! আজ সকালে বারান্দায় বসে খেয়াল করলাম, জানালার পাশে অচেনা এক বৃক্ষের পাতায়ও রোদের রং লেগেছে।

রোদ আমাকে আগে কখন এমন অভিভুত করেনি। গাছের ছোট ছোট পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে মুহুর্তেই আমার সদ্যোজাত শিশুর কথাই মনে পড়ে গেলো। যাকে প্রাণভরে আদর করার আগেই নভেল করোনা আমাকে অনেক ‘দূর’ করে দিয়েছে! আমার পাশের রুমটাতেই আমার ছেলে থাকে, মাঝে মাঝে কান্না করলে আমি ওর কান্না শুনতে পাই। ওর কান্না আমার কাছে দূর থেকে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জনের মত মনে হয়! আমি অনুভব করি। কান্না আমার এত প্রিয় ছিলো না! আমার স্ত্রী তার অন্তরের সকল ভালবাসা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে নবজাতক অপরদিকে আমি! সে সারা চেহারা জুড়েই পরিশ্রান্ত কিন্তু মোটেও ক্লান্ত নয়!

আমি তাকে এক নতুন রূপে আবিস্কার করেছি। আমার মা প্রায়ই পর্দার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আর নিভৃতে কাঁদে। আমি না দেখার ভান করি! এরমধ্যে কয়েকজন আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, জানালার গ্রীল দিয়ে কথাও হয়েছে। বসে বসে সবার ভালবাসায় সিক্ত আমি ভাবছি,

‘অকৃতী অধম জেনেও তো তুমি কম করে কিছু দাওনি।’ আমি ছোটবেলা হতেই ব্যক্তিগতভাবে মারাত্নক সাহসী আর আত্মপ্রত্যয়ী। কাজেই আমি একদমই ভীত নই বরং কিছুটা চাঞ্চল্য রয়েছে। কালী প্রসন্ন সিংহের ভাষায়, ‘এ জীবনের কোনো কিছুই সত্যি নয়, সত্যি শুধু চঞ্চল মুহুর্ত গুলো আর চলে যাবার ছন্দটুকু।’ আমার এই চঞ্চল মুহুর্তগুলো দ্রুতই চলে যাবে ইনশাআল্লাহ। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আলবেয়ার কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’ বইয়ের দুটি লাইন খুব বেশী মনে পড়ছে “কোনো মরা গাছের গুড়িতে বসে শুধু আকাশ দেখার সুযোগ পেলেও আমি বেঁচে থাকতে চাই!”