সম্পাদকীয়:

জন্ম নিবন্ধন বা (Birth Certificate) একটি দেশ, একজন শিশু কিংবা একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনআইডি (National ID Card) এর পর একজন নাগরিক বা দেশের কাছে জন্ম নিবন্ধনের স্থান। আমি কোন দেশে জন্মগ্রহণ করেছি, কোন স্থানে জন্মগ্রহণ করেছি, আমি কোন ধর্মালম্বী, আমার পিতা-মাতা কারা? ইত্যাদি তথ্যের ভিত্তিতেই একটি জন্ম নিবন্ধন হয়ে থাকে।

প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই দেশের নাগরিকত্ব লাভের জন্য এনআইডি কার্ডের প্রয়োজন হয়, আর এই এনআইডি কার্ড করতে প্রথম প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জন্ম নিবন্ধন।

আজ আমার জন্ম নিবন্ধন নেই, নেই কোন এনআইডি যা খুবই দুঃখের বিষয়। আমার বাড়ী কক্সবাজার জেলায়। সারাদেশে ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় ৬০/৬১ জেলায় অনায়াসে সম্পন্ন করা যায় জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম। বাকি যে ৩/৪ টা জেলায় জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ ছিল তাঁর মধ্যে আমার কক্সবাজার জেলা সহ আশেপাশের কয়েকটি জেলা রয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মায়ানমারে ইনফ্লাক্সের পর রোহিঙ্গারা টেকনাফ – উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। এর পরের মাসে ২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সরকার কক্সবাজার জেলার জন্ম নিবন্ধন সার্ভার বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে বন্ধ রাখা হয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম।

এই জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রাখার ফলে সীমাহীন ভোগান্তিতে ছিল জেলার সাধারণ জনতা। প্রয়োজনে হাতে পাওয়া যায় না জন্ম নিবন্ধন। তবে দালাল চক্রের হাতে ৪/৫ হাজার টাকা দিলে ১৫/৩০ দিনের জন্য অনলাইনে শো করে এমন জন্ম নিবন্ধন হাতে পাওয়া যেতো। রোহিঙ্গারা এদেশের নাগরিকত্ব লাভ করবে এমন ভয়ে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন সরকার। তবে আমাদের দেশের কিছু সোনার ছেলেরা টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেক রোহিঙ্গাদের জন্ম নিবন্ধন ত দূরের কথা এনআইডি পর্যন্ত করে দিয়েছে। আমাদের দেশে সোনার ছেলেরা যদি ভালো হতো তাহলে সরকারকে সার্ভার বন্ধ করতে হতো না যা আমার মনে হয়।

২০১৭ সালের ১৯ শে সেপ্টম্বর সার্ভার বন্ধ করার পর জনসাধারণের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে দীর্ঘ ২৮ মাস পর চলতি বছরের ৩১ শে আগষ্ট সীমিত আকারে ডজন খানেক ইউনিয়ন এবং ৩/৪ টা পৌরসভায় পরীক্ষামূলক জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জনাব হেলাল উদ্দিন স্যার।

জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হয়েছে মহা খুশি জনতা। কিন্তু সেই খুশিটাই যেন ধুলিসাৎ করে দেয় আবেদন প্রক্রিয়া দেখলে। নানান জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করতে; তা অবশ্য সার্বজনীন চিন্তা করলে খুবই কষ্টসাধ্য সাধারণ জনতার জন্য। রোহিঙ্গাদের ভয়ে এই জটিল কার্যক্রম তা অবশ্য সাধারণ জনতা আন্দাজ করে কষ্ট হলেও মুটামুটি আবেদন করে যাচ্ছে দৈনিক।

আমার জন্ম স্কুল সার্টিফিকেট অনুযায়ী ২০০০ সালের পর আমার জন্ম আমি নিবন্ধনও করাবো সেই সাল/তারিখ দিয়ে। কিন্তু এখন আমার জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে ডকুমেন্টস এ আমার পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সংযুক্তি করতে হবে যা খুবই কষ্টসাধ্য। কারণ হিসাবে বলতে গেলে ২০০০ সালেও চালু হয়নি দেশে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম খুবই কষ্ট সাধ্য হয়ে গেলো ব্যাপারটা।

জন্মসনদ অত্যাবশ্যকীয় করার লক্ষ্যে সরকার নতুন করে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন ২০০৪ প্রণয়ন করে। জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, শিশু অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আইনটি ৩ জুলাই ২০০৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন আইনে বলা হয়েছে, বয়স, জাতি-গোষ্ঠি, ধর্ম-কিংবা জাতীয়তা সকল নির্বিশেষে বাংলাদেশে জন্ম গ্রহণকারী প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষে জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনকারীকে একটি সার্টিফিকেট দেবেন।ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পদক্ষেপ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। সারাদেশে সরাসরি জন্ম নিবন্ধনের পাশাপাশি অনলাইনেও নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। (তথ্য: উইকিপিডিয়া)

এখন মূল কথা বলা যাক, আমার জন্ম ২০০০ সালের পর কিন্তু পিতা-মাতার জন্ম ১৯৮০/৮৫ এর দীকে তখন ঘরে ঘরে জরিপ করে এনআইডি কার্ড দেওয়া হতো তখন জন্ম নিবন্ধন ছিলনা। জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয় ২০০০ সালের পর থেকে। এখন আমার জন্ম নিবন্ধন করতে হলে আমার পিতা মাতার জন্ম নিবন্ধন প্রয়োজন এনআইডি দিয়েও কাজ হবেনা কোন ভাবেই।

আমার পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন করতে বলা হলো, কাগজ পত্রে সংযুক্তি করতে হবে আমার দাদা-দাদীর এনআইডি যদি বেঁচে থাকে নয়তো মৃত্যু সনদ এটাও আরেকটা জটিল বিষয় কারণ আবেদন পরবর্তী ৪/৫ দিনেও মিলেনা মৃত্যু সনদ। আমার দাদি নেই মৃত্যু সনদ প্রয়োজন আবেদন করব তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু আমার পিতার জন্ম নিবন্ধনের জন্য ওনার বা আমার দাদা-দাদীর বায়োমেট্রিক সিম কার্ডের নাম্বার দেওয়া লাগবে। তাঁতেও সমস্যা নেই, দাদা প্রবীণ বৃদ্ধ তাঁর নেই কোন সীম বা মোবাইল নাম্বার আমার পিতার টা দেওয়া যাবে।

এখন আসি আমার মায়ের বেলায়, ওনার এনআইডি আছে কিন্তু ওনার নামে কোন সীম নেওয়া হয়নি। ওনার কোন সীম না থাকলে অবশ্যই আমার নানা-নানির সীম নাম্বার লাগবে কিন্তু তাঁরা তো সেকেলে ধরনের লোক নাই কোন মোবাইল নাই কোন সীম তাহলে আমার মায়ের জন্ম নিবন্ধন করবো কিভাবে?

সর্বোপরি এত লম্বা কাহিনী টা পড়ার জন্য পাঠককে অসংখ্য ধন্যবাদ। এত লম্বার লেখনীর দ্বারা নিজের উদাহরণ দিয়ে সার্বজনীন চিন্তা করে বলব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে। আপনারা রোহিঙ্গাদের ভয়ে এত জটিলতা এনেছেন জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমে ভালো কথা। কিন্তু জনসাধারণে চিন্তা মাথায় রেখে আবেদন প্রক্রিয়া টা আরেকটু বোধগম্য বা সহজতর করার অনুরোধ জানাবো। বর্ণনায় হয়তো আমার সমস্যা ওঠে এসে এক ধরনের, সাধারণ জনতার কাছে আরো বহু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

পরামর্শ: এখন জন্ম নিবন্ধনের জন্য  আবেদন করার পরেও ভেরিফাই করতে সরেজমিনে সরকারি টিম আসবে শুনতেছি। সুতরাং, সরেজমিনে যেহেতু সরকারি টিম আসবে সেহেতু আবেদন প্রক্রিয়া আরেকটু সহজ করা যাবে বলে মনে করি।

রিয়াদ মোহাম্মদ সাকিব
মাতারবাড়ী-মহেশখালী।