মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সূরা-আ’রাফের ১৫৭ ও ১৫৮ নং আয়াতে তাঁর হাবীবে মুকাররাম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্য “উম্মী” শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আয়াতদ্বয়ের তাফসীরে যুগ শ্রেষ্ঠ মুফাচ্চিরীনে কেরাম বলেন, এই শব্দটি ব্যবহারের দ্বারা আল্লাহ তায়ালা নবীজির গুণাবলী বর্ণনা করেছেন। যেমন, প্রখ্যাত মুফাচ্চির আল্লামা ইবনে কাছীর (রা:) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ #তাফসীরুল_কুরআনিল_আযীমে সূরা আ’রাফের ১৫৭ নং আয়াত
الذين يتبعون الرسول النبي الأمي الذي يجدونه مكتوبا عندهم في التوراة والإنجيل…الخ
এর তাফসীরে বলেন,
وهذه صفة محمد صلى الله عليه وسلم في كتب الأنبياء بشروا أممهم ببعثه وأمروهم بمتابعته.
” আর এই সকল পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামের কিতাবে বর্ণিত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র গুণাবলী। এর দ্বারা তাঁরা তাঁদের আপন আপন উম্মতকে তাঁর(মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র) আগমনের শুভসংবাদ দিতেন এবং তাঁর অনুসরণের আদেশ দিতেন।”

আর ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কিছু না লিখা ও না পড়ার কারণ বর্ণনায় স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সূরা আনকাবুতের ৪৮ নং আয়াতে বলেন,
وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
” আর আপনি তার পূর্বে ( কুরআন নাজিলের পূর্বে) কোন কিতাব পড়তেন না এবং আপনার হাতে কোন কিছু লিখতেন না। (কারণ ইতোপূর্বে যদি আপনি লিখতেন ও পড়তেন) তাহলে বাতিলরা ( কুরাইশ ও ইয়াহুদী খ্রিস্টান) অবশ্যই (কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে) সন্দেহ পোষণ করতো।”
অত্র আয়াতের তাফসীরে রয়ীসুল মুফাচ্চিরীন ওয়া হিবরু হা’যিহিল উম্মাহ্ সাইয়্যেদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন,
كان نبيّ الله صلى الله عليه وسلم أمِّيا؛ لا يقرأ شيئا ولا يكتب.
” আল্লাহর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মী ছিলেন; তিনি কোন কিছু লিখতেন না এবং পড়তেন না।”
তাঁর দু’জন বিশিষ্ট ছাত্র হযরত কাতাদা এবং মুজাহিদ (রা:) ও একই মত পোষণ করেছেন।(তাফসীরে তাবরী)
একই আয়াতের তাফসীরে অপর প্রখ্যাত মুফাচ্চির আল্লামা ইবনে কাছীর (রা:) বলেন, “রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত কোন কিছু লিখতেন না এবং পড়তেন না।”
***তবে নবীজি মদীনা হিজরতের পর নিজ হাতে লিখার বর্ণনাও হাদীছ গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায়।

#আমরা_মনে_করি, নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন শরীফ আল্লাহর প্রেরিত হওয়ার ব্যাপারে তৎকালীন ইয়াহুদী-খ্রিস্টান ও কুরাইশদের সন্দেহ দূর করার জন্য লিখতেন না। কারণ যদি তারা ওহী নাজিলের আগে থেকেই নবীজিকে কোন কিছু লিখতে পড়তে দেখতো, তাহলে কুরআন নবীজির রচিত বলে অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করতো। তাছাড়াও আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহে নবীজির নবুয়তের প্রমাণ স্বরূপ যে সমস্ত আলামত বর্ণনা করেছেন তন্মধ্যে একটি হলো, ” সেই নবী হবে উম্মী অর্থাৎ লিখবেনও না পড়বেনও না।

উম্মী শব্দের অর্থ:
“উম্মী” শব্দটি “উম্মুন” শব্দমূল থেকে নির্গত। যার অর্থ: মূল বা আসল। আরবিতে মাকেও “উম্মুন” বলা হয়। কারণ মা হচ্ছে সন্তানের মূল।
*** সূরা ফাতিহার নাম “উম্মুল কিতাব” রাখা হয়েছে। যেহেতু সমগ্র কুরআনের ইলম আল্লাহ তায়ালা সূরা ফাতেহায় একত্রিত করে রেখেছেন। সেই হিসাবে আল্লাহ তায়ালা নবীজির নাম রেখেছেন “আন-নাবীয়্যুল উম্মী”। যেহেতু আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সবকিছুর জ্ঞান তাঁর মধ্যে একত্রিত করেছেন।
*** পবিত্র কুরআনে মক্কাকে উম্মুল কুরা(আদি নগরী) বলা হয়েছে। যেহেতু পৃথিবীর ভূখণ্ডের মধ্যে সর্ব প্রথম পবিত্র মক্কা নগরী অস্তিত্ব লাভ করেছিল। সেই হিসাবে নবীজিকে “আন-নাবীয়্যুল উম্মী” বলা হয়েছে। যেহেতু সব সৃষ্টির আগে আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে সৃষ্টি করেছেন।

আরবি অভিধান গ্রন্থ সমূহে উম্মী শব্দের অর্থ করা হয়েছে,
والأُمِّيُّ من لا يقرأ ولا يكتب
আর উম্মী হলো যে লিখতে পড়তে জানে না।( আল-মু’জামুল ওয়াসীত)
কিন্তু শব্দটি যখন নবীজির দিকে সম্পৃক্ত করা হবে, তখন অর্থ হবে লিখতেন না এবং পড়তেন না। লিখতে জানতেন না বা পড়তে জানতেন না বলা কখনোই বৈধ হবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে সব কিছুর জ্ঞান দান করেছেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ ۚ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
“আর আপনার প্রভু আপনাকে তা সবকিছু শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি ইতোপূর্বে জানতেন না।” (সূরা নিসা, আয়াত:১১৩)
নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
بعثت معلما
” আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।”( দারেমী, হাদীছ নং:২৫২, ইবনে মাজাহ, হাদীছ নং:২২৫)
নবীজি আরো বলেন,
علمني ربي فأحس تعليمي
“আমার প্রভু আমাকে ইলম শিক্ষা দিয়েছেন খুবই উত্তমভাবে।” অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে ইলম দানের ক্ষেত্রে কোন ধরনের অপূর্ণতা রাখেননি।
হযরত সাইয়্যেদুনা আবু যার আল-গিফারী (রা:) বলেন,
ترَكَنا رسولُ اللهِ ﷺ وما طائرٌ يطيرُ بجَناحَيْهِ إلّا عندَنا منه عِلمٌ
“আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের রেখে ইন্তেকাল করেছেন। আর এমন কোন পাখিও তার ডানা দ্বারা আকাশে উড়ে না, যার জ্ঞান তিনি আমাদের নিকট দান করেননি।”(সহীহ ইবনে হিব্বান) অর্থাৎ পাখিরা আকাশে ডানার সাহায্যে যেভাবে উড়ে, সেই জ্ঞানও রাসূলে কারীম (ﷺ) ইন্তেকালের আগে আমাদের দান করেছেন।
অপর বর্ণনায় এসেছে। সাইয়্যেদুনা আবু যার আল-গিফারী (রা:) বলেন,
لقدْ ترَكَنا رسول اللهِ ﷺ وما في السماءِ طائرٌ يطيرُ بجناحَيْهِ إلّا ذَكَّرَنا منه عِلْمًا
“আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের রেখে ইন্তেকাল করেছেন। আর এমন কোন পাখিও তার ডানা দ্বারা আকাশে উড়ে না, যার জ্ঞান তিনি আমাদের নিকট দান করেননি।”(হায়ছামী রা:, মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ, আহমদ ইবনে হাম্বল রা:, আল-মুসনাদ)

কিন্তু খুবই দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকালকার অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারী মৌলভী পর্যন্ত মহানবীর জ্ঞান বিষয়ে মহান আল্লাহর এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও বলতে দ্বিধাবোধ করে না যে, নবী ইলিটারেট কিংবা নিরক্ষর ছিলেন! ( নাঊযূবিল্লাহ্)
***আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে “উম্মী” বলেছেন পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি জ্ঞানী বুঝানোর জন্য। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো থেকে শিখেননি। আর এই মৌলভী সাহেবান মানুষকে বুঝাচ্ছে নবী নিরক্ষর ছিলেন!

তাদের মতে, পৃথিবীবাসী থেকে কয়েক বছর শেখার পর মানুষ “হযরতুল আল্লামা” হয়ে যেতে পারে। আর স্বয়ং রাব্বুল আলামীন থেকে শিখে নিরক্ষরই থেকে যায়!!!( কি অদ্ভুত তাদের বিবেচনাশক্তি!)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বুঝার তাওফিক দান করুন।
اللهم آمين بحرمة الرسول النبي الأمي الأمين.

মুহাম্মদ আবদুল আজিজ
প্রাক্তণ শিক্ষার্থী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।