আ ন ম হাসান: 

পড়া লেখা ও খেলা ধুলায় যখন বন্ধুরা মেতে থাকে তখনই রেস্তোরার তালা বাসন, গ্লাস ধোয়া ও টেবিল পরিষ্কারে ব্যস্ত থাকে সিফাত। মা বাবা যেন থেকেও নেই! ভোর বলেই ছুটতে হয় কাজে। যে বয়সে বন্ধুরা ব্যাগ কাঁধে স্কুলে ছুটে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে মানুষ হওয়ার গল্প শুনে, সে সময়ে সংসার চালাতে কাজের পিছনে ছুটেন রায়হান উদ্দিন সিফাত (১৫)।

৩০এপ্রিল (শুক্রবার) সন্ধ্যায় মহেশখালী পৌরসভার মিষ্টি মুখ হোটেলের ক্লিনার রায়হান উদ্দিন সিফাত বলল তার বিষন্ন জীবনের নানান কথা। বাবা অসুস্থ হয়ে ঘরে বসে আছে, স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আর বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, তার কাঁধে এখন সংসারের বোঝা।

সিফাত বলেন, বাবা এখন কাজ করতে পারেন না। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় তাকে কাজ নিতে হয় চায়ের দোকানে। বাড়িতে মা আর ছোট ২ ভাই আছে।
সিফাত তার স্বপ্নের কথা বলতে যেয়ে বলেন,
তার ভাইয়েরা একদিন বড় হয়ে বড় বড় চাকরী পাবে, মানুষের সেবা করবে। সেই সাথে তার কথায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে ৷ বলে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করলেও মজুরী খুবই কম। এতে করে সংসারের হাল ধরা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে ৷

শুক্রবারের দিন সকালে কথা হয় আরেক শিশু শ্রমিক রফিকের সাথে। ২ বছর পূর্বে অভাবের তাড়নায় বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয় যে। বাবা কাজ করে না, সংসারে সে সহ মোট ৬ সদস্যের পরিবার। সাগর বলেন, পান বরজে কাজ করে প্রতিদিন ১৫০/২০০ টাকা আয় হয়। এই আয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। কোনদিন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাই না। মে দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, দিবস সম্পর্কে জানিনা, দিবস দিয়ে কি হবে ? হাত না চললে তো ভাত’ খেতে পারি না।

একই অবস্থা শফিকুল ইসলামের (১৫)। ৫ম শ্রেণীর পর আর পড়তে পারে নাই। বর্তমানে ইট ভাটায় কাজ করে সে। মাকে হারিয়েছে অনেক বছর হবে ৷ বর্তমানে বাবাও কাজ করতে পারে না। ছোট ভাইকে নিয়ে তাদের ৪ জনের সংসার। শফিকুলের আয়ে কোনরকম সংসার চলে।

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে চাকরি করা সেলিম নামে একজন বলেন, কোম্পানির প্রকৃত বেতন আমরা পাই না। অনেকে কমিশন নিয়ে নেয়। যেকোন মুহূর্তে ছাটাই হবার ভয় থাকে !

এমন নানান জনের গল্প প্রতিদিনের। করোনার এই মহামারীতে কারো আয় রোজগার নেই। পেলেও কোন রকম সংসার চলে। এতেও শ্রমজীবী মানুষের শঙ্কা কাটে নাই। এখনো দাবি আদায়ে শ্রমিকদের নানান আন্দোলন করতে হয়।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি কলিম উল্লাহ কলিম বলেন, কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে হোটেল-মোটেলে। মে দিবসে একটাই দাবি, শ্রমিকদের যেন বেতন-বোনাস দেওয়া হয় এবং হোটেল-মোটেলে যেন নিয়োগ পত্র দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, হোটেল-মোটেল কর্মচারীদের যেন কর্মঘন্টা নির্ধারণ করা হয় এবং তাদেরকে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে চাইলে এড.হামিদুল হক জানান ” বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরীর হার নির্ধারণ, মজুরী পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও চাকুরীর অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ইত্যাদির কথা থাকলেও মালিকরা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় উদাসীন ও অনেক ক্ষেত্রে শোষন করে থাকে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যদি বদ্ধপরিকর না হয় তাহলে শ্রমিকরা সারা জীবন অবহেলিত থাকবে। তাছাড়া, শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর অবস্থান শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে হবে।