স্বাধীনতার আলোকে মহেশখালীঃ
“বর্তমানের মহেশখালী
হানাদারমুক্ত রাজাকারের দ্বারা পরিচালিত।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সেই প্রভাবশালীদের হাতে
যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে,
মুক্তিযুদ্ধাদের অপদস্থ করেছে”

মহেশখালী সাগর ঘেরা পাহাড়-পর্বতে ভরা ব্যতিক্রমী দ্বীপাঞ্চল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানব সৃষ্ট অনাচার মহেশখালী বাসীদের সাহসী না করে ভীরু করে রেখেছে। অশিক্ষা কৃত্রিম দারিদ্র্য সার্বিক পরিবেশ সংগ্রামী না করে তাদের ভেতর সামন্ত্রতান্ত্রিক দাসভিত্তিক অবস্থা বিনির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছে। অর্থ উপার্জনই শিক্ষার মূল হাতিয়ার বিবেচনায় রেখে শিক্ষিত সমাজ জমিদার পুঁজিপতি ধনিক শ্রেণীর হাতে নিজেদের জিম্মি রাখার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বিভোর।
আমার নিজস্ব চিন্তায় স্পষ্ট দেখতে পাই ১৯৭১ সালের আগে পুরো মহেশখালী পরিচালিত হতো সাম্প্রদায়িক মানসিকতার উপর। যারা এলাকা পরিচালনা করতেন তারা জমিদারের আনুকূল্যে সরকারের অনুগ্রহে পরিচালিত হয়ে দাসের জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এলাকার উন্নয়নে কিছু কিছু কাজ করার প্রবণতা থাকলেও তাতে তাদের স্বার্থই প্রধান হিসেবে বিবেচ্য ছিল। লেখাপড়ায় অনগ্রসর ছেলে মেয়ে চোখে পড়লে নানা উপঢৌকনে প্রলোভনে কিংবা কোন অন্য কোন উপায়ে তাকে বশ করে নিয়ে নিজেদের করে রাখে। মেয়ে দিয়ে দিয়ে মাথা কিনে নেয়। সমাজ থেকে শেখা মেনে নিয়ে পথ চলা রপ্ত করে নিজের স্বক্রিয়তা বিসর্জনে শিক্ষিত সমাজ নিজেদের স্বাধীনতা বিপন্ন করে। এরই ফলশ্রুতিতে জোরদার জমিদার স্বেচ্ছাচারী মোড়লরা তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। ঘরজামাই হয়ে শিক্ষিত জনতা তাদের আত্মসম্মান বিসর্জন এর মধ্য দিয়ে দাসে পরিণত হয়। কেনা গোলামের শিক্ষার মূল্য থাকতে পারে না।

ধলঘাটায় ভদাইয়ার পরিবার, ফলর রব পরিবার, মাতারবাড়িতে সিকদার পরিবার, কালামারছড়া বদি উদ্দিনের পরিবার, পেছেইকা বর পরিবার, হোয়ানকে রাজার বর পরিবার, লদ্দিনর পরিবার, মহেশখালীতে আউজ্জরো পরিবার, পৌরসভায় সিকদার পরিবার, শলর পরিবার অধিকাংশই জমিদারের ও সরকারের আজ্ঞাবহ আনুকূল্যে বেড়ে উঠে এবং সহায় সম্পত্তি ও এলাকা পরিচালনায় ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। এদের ভিতর সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব ব্যাপক ভাবে কাজ করে।স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের ভূমিকা রহস্যজনক’ পারত পক্ষে বিপক্ষে অবস্থানকারী হিসেবেই চিহ্নিত।

মহেশখালীতে তেমন কোনো সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। হানাদার বাহিনীর নিয়মিত উপস্থিতিও ছিল না। যে কয়দিন ছিল তাতেই হিন্দুদের উপর নির্যাতন, ঘর বাড়ি পোড়া, হত্যার মতো কাজ করে। এদের ভিতর হিন্দু বিদ্বেষ ব্যাপক ভাবে কাজ করে এবং তাদের পাড়ায় গিয়ে অত্যাচার নির্যাতন চালায়। মুসলিম পরিবারের উপর তাদের রোষ দেখা দেয় স্থানীয় শত্রুতার জের হিসেবেই।
আমার ধারনাই যে সমস্ত হিন্দু ভদ্রলোক মুসলিম লীগ কিংবা হানাদার বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আনুকূল্যে ছিল তারাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের বুঝে উঠার আগেই হানাদার বাহিনী ভাঙচুর, পোড়া, হত্যাকান্ড চালায়।

হানাদারমুক্ত রাজাকার দ্বারা পরিচালিত মহেশখালীঃ
স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আগে থেকেই সজাগ থাকার চেষ্টা করে। অধিকাংশই ভারত চলে যান বাকিরা বিভিন্ন ব্যক্তির আওতায় বিভিন্ন মুসলিম পরিবারে অবস্থান গ্রহণ করে নিজেদের জীবন বাঁচায়। এখানে বাধ্য করে কিংবা বুঝিয়ে-সুজিয়ে হিন্দুদের কালেমা শেখায় এবং খতনার মাধ্যমে মুসলিম বানানোর আয়োজন করে। আশ্রয়ে থাকা অনেক হিন্দু মহিলা তাদের সম্ভ্রম হারায় দুষ্টু প্রকৃতির লোকের অপকর্মে।
বড় কোনো পরিবার স্বাধীনতাকামীদের সাথে জড়িত না থাকার কারণে নানা মামলা-মোকদ্দমা মানবিক নির্যাতনে ঘরছাড়া হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এখানে যারা স্বাধীনতা কামনা করেছে তাদের অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান হওয়ায় সামাজিক ভীত তৈরীতে এরা দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবল তাপে চাপে রাজাকার হানাদার বাহিনী তাদের প্রভাব চালায় চূড়ান্তভাবে।
১৯৭১ পরবর্তী সময়ে মহেশখালীতে বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের আবির্ভাব ঘটে। স্বাধীনতার যৎসামান্য সুফল দেখা দেয়। বিভিন্ন ইউনিয়নের নতুন নতুন পরিবার এলাকায় শাসন কাজে হাত দেয়।
ধলঘাটায় গোলজানির গোষ্ঠী (মৌলভী মকবুল), বুড়ির গোষ্ঠী কালারমার ছড়ায় সুরা বর গোষ্ঠী, নাসির উদ্দিনের গোষ্ঠী, হোয়ানকে রুজ্জা বর গোষ্ঠী ,
হামিদুর রহমানের গোষ্ঠী, ভোয়াইয়ার গোষ্ঠী, বড় মহেশখালীতে নাইজ্জারো গোষ্ঠী, লেঙ্গার গোষ্ঠী, কুতু্বজুমে ২নং কবিরের গোষ্ঠী, ছোট মহেশখালীতে মোহাম্মদ আলীর গোষ্ঠী শাপলাপুরে কাজিমুদ্দিন, হেলালি, মনির, নাজেম, খালেকের বর গোষ্ঠী, পৌরসভায় পেতেইন্নারো গোষ্ঠী, মাতারবাড়ীতে ইসমাইল নুরের গোষ্ঠী প্রমুখ গোষ্ঠী রাজনীতি মহেশখালীতে সক্রিয় হয়।
এদের শ্রেণীচরিত্র কাজকর্ম মন-মানসিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ গোষ্ঠী সেই পুরানো আবহে জড়িত। স্বাধীনতার স্বপ্ন সাধ পাওয়ার ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় কম।
এক সময়ে এলাকার জমিদার প্রভাবশালীরা পাখি শিকার, হরিণ শিকার করতো। সে সময়ে মহেশখালী পাহাড়ে হরিণ, শূয়র, বন মোরগ-মোরগী সহ বিচিত্র ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল। সৌখিন শিকারি হিসেবে প্রভাবশালীরা নিজেদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র রাখত এবং বিশ্বস্ত লোক রেখে তাদের কাঁধে বন্দুক তুলে দিয়ে শিকারে বেরুত। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন জনের হাতে থাকা সরকারি অস্ত্র উদ্ধারে এসে সরকারি কর্মকর্তারা নানারকম অনাচার করে। কালারমারছড়ায় অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আসা কর্মকর্তাদের সাথে মোহাম্মদ শরীফ চেয়ারম্যানের মনোমালিন্য হয়। এক সময় গুলির আঘাতে তার মৃত্যু ঘটে। তার কোন মুক্তিবাহিনী ছিলনা। হানাদার রাজাকার নির্মূলে তার অস্ত্র ব্যবহার হয়নি। সৌখিন শিকারি অস্ত্র জমা দিতে অপরাগতা জানাই। সেই সময় এই হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় তিনি শহীদের মর্যাদা পেয়ে যান।
যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ প্রাপ্ত হয়েছেন এদের অধিকাংশই মনের তাড়নায়, খুশির ছলে, আপন আনন্দে কোন না কোন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট ছোট যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে। এদের পারিবারিক অবস্থান এলাকায় তেমন কোনো ব্যাপক ভূমিকা রাখার বিষয় ছিলনা। লকিয়ত উল্লাহ, আহমদ উল্লাহ কালারমারছড়ার মৌলানা পরিবারের সদস্য। এরা রাজনীতিতে তেমন কোন সক্রিয় ছিল না। এরা সম্মানী লোক। এলাকার মানুষ এদের ভক্তি শ্রদ্ধা করে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। এদের রয়েছে প্রচুর মুরিদ। এরা সজ্জন ভদ্র নম্র শিক্ষিত। স্বাধীনতার বোধ এদের আকৃষ্ট করে যা মহেশখালীর জন্য একটি অন্যান্য দৃষ্টান্ত। এরা কোনো সুযোগ-সুবিধা কামনা করেন না। এরা প্রতাপশালী প্রভাবশালীদের কেউ নন। রাজনীতির বাইরে এদের অবস্থান তাদেরকে অন্য আসনে আসীন রেখেছে।
বিভিন্ন ইউনিয়নে অন্য যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদপ্রাপ্ত এদের অধিকাংশই নিরীহ সাধারণ ঘরের সন্তান। দু‘একজন প্রভাবশালীদের পরিবারের হলেও তারা তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। পরিবারের অন্যান্য প্রভাবশালী সদস্যরা রাজাকার কিংবা হানাদার বাহিনীর দোসর।
বর্তমানের মহেশখালী হানাদারমুক্ত রাজাকারের দ্বারা পরিচালিত। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সেই প্রভাবশালীদের হাতে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, মুক্তিযুদ্ধাদের অপদস্থ করেছে, মা বোনের ইজ্জত হরণে অপতৎপর ছিল। ক্ষমতার আসনে অধিকাংশই তাদের পরিবার ভূক্ত। মহেশখালীর পরিবর্তন চোখে পড়ে না। মহেশখালী যেমন পরাধীন ছিল এখনও পরাধীন রয়ে গেল। স্বাধীনতার স্বাদ মহেশখালীবাসী পায়নি। স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি কে পরিচালনায় দৃশ্যমান মনে হলেও ভিতরের চিত্র অন্যরকম যেই লাউ সেই কদু। মহেশখালী স্বাধীনতাহীনতায় থেকে গেল।

লেখক:-মোহাম্মদ ছরওয়ার কামাল
অধ্যক্ষ ,হোয়ানক কলেজ, মহেশখালী।