যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে চায়ের দোকানের কারিগর থেকে লাখপতি বড় মহেশখালীর নুর বক্স-

নেপথ্যে ইয়াবা ব্যবসা!

আ ন ম হাসান:

মাত্র কয়েক বছর আগেও বসবাসের জন্য ছিল মাত্র একটি টিনের ঘর। চায়ের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করতেন হোয়ানক ইউনিয়নের কেরুনতলী বাজারে নিজ পিতার চায়ের দোকানে। ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। পিতার ছিল না তেমন কোনো সহায় সম্পত্তি। ছিল শুধু ভাড়া করা দোকানে একটি চায়ের দোকান। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো হঠাৎ করেই বদলে গেল তার জীবন। আর এই জীবন বদলের খেলায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যুবলীগের নাম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কেরুনতলী বাজারে চায়ের দোকান করার সময় পরিচয় হয় পুলিশের খাতায় শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত হোয়ানক ইউনিয়নের কালালিয়া কাটা গ্রামের বাসিন্দা আকতার হামিদ চৌধুরীর সাথে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত লাভ করে তার হাত ধরেই জামাত-বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত হন নুরবক্স। শিবির ক্যাডার আকতার হামিদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে বিয়ে হয় কালালিয়া কাটা গ্রামের বিএনপি রাজনীতি সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের এক মেয়ের সাথে।
পরবর্তীতে পিতার মৃত্যুর পর নূরবক্স চায়ের দোকান ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন গ্রামের বাড়ি বড় মহেশখালী শুকরিয়া পাড়ায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিজস্ব বসতভিটা এলাকার ব্যবসায়ী মরহুম হাজ্বী শরিফ সওদাগরের কাছে বন্ধক দিয়ে কোনো রকম পাড়ি জমান দুবাই প্রবাসে।
বছর তিনেক থাকার পর ফিরে আসে বাংলাদেশে। তখন ছিল বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমল। সুযোগ বুঝে সময়ের সদ্ব্যবহার করে নাম লেখান যুবলীগে। চাউর আছে প্রবাসে উপার্জন করা টাকার বিনিময়ে সবাইকে ম্যানেজ করে ভাগিয়ে নেন বড় মহেশখালী ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদটি।

যুবলীগের পদ পেয়ে হয়ে যান আলাদীনের প্রদীপের সেই দৈত্যটি! ছাড়িয়ে নেন নিজের বন্ধক দেওয়া বসতভিটা। যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে অবৈধভাবে শুরু করেন মাটি বিক্রি ও স্কেভেটর দিয়ে মাটি খুড়ার ঠিকাদারি কাজ। গড়ে তুলেন তুহিন এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে দাপিয়ে বেড়ান পাসপোর্ট অফিস ও ভূমি অফিসে। এলকার সবার কাছে তিনি ইয়াবার ডন হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের সমস্যা হলে শালিশ/দরবার করার নামে অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

২০১৫ সালে বদরখালী চালিয়াতলীস্হ আলি ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে ইয়াবা পাচারের সময় পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে যান। কিন্তু যুবলীগের নাম ব্যবহার করে কিছু দিন যেতে না যেতেই কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন নুরবক্স ৷২০১৩/১৪ সালের দিকে অনিক চার্জারের প্যাকেটে ভরে পাচারের সময় ২শো পিছ ইয়াবা সহ কালারমারছড়া ফাঁড়ি পুলিশের হাতে আটক হন নুর বক্স ৷

পৈত্রিক সম্পত্তি বলতে ছিল শুধু মাত্র ১০ শতাংশ বসতভিটা ও টিন সেট মাটির ঘর। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে নুর বক্স হয়ে যান দু’টি বসতভিটা, দু’টি সেমিপাকা বিল্ডিং, শুকরিয়া পাড়া বাজরে একটি দোকানের মালিক। যার আনুমানিক বাজার মূল্য বর্তমানে অর্ধ কোটি টাকা। এছাড়াও মহেশখালী পূবালী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে নামে বেনামে ব্যাংক হিসাব।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নুর বক্সের প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি সম্পদ রয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও চায়ের দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। সেখানে আজ সেই নুর বক্স লাখপতি ! রাতারাতি বদলে যেতে থাকে জীবন। আর এর পেছনে কাজ করেছে যুবলীগের পরিচয়টি। যুবলীগের নাম ব্যবহার করে ফায়দা নিয়ে নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা। স্থানীয় যুবলীগের কর্মীরা তার মুখের উপর কথা বলতে পারেনা, ফলে যুবলীগের নাম ব্যবহার করলেও কেউ তাকে কিছুই বলেনি।
২০১০/১১ সালের আগেও নুর বক্স শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু বর্তমানে যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবজি সহ নানান অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে ৷
জানা যায়, নুর বক্সের নামে মহেশখালী থানায় ইয়াবা মামলাও রয়েছে।

সম্প্রতি গত ৩০ জানুয়ারি উখিয়ার ইয়াবা সুন্দরী হিসেবে খ্যাত হাসিনা আক্তার’র নুর বক্স ও ইউনুস’র সাথে ইয়াবা আদান প্রদানের সময় এলাকাবসী হাতেনাতে ধরলে ইয়াবার বিষয় টি ধামাচাপা দিতে ইয়াবা পাচারকারী হাসিনা আক্তারকে দিয়ে সুকৌশলে মহেশখালী থানায় ইউনুসের বিরুদ্ধে স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ দায়ের করে ইয়াবার ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে নূরবক্স ৷

এবিষয়ে নূরবক্সের সাথে সামনাসামনি বসে আলাপ করলে ইয়াবা মামলার কথা স্বীকার করে বলেন, তার প্রতিপক্ষরা মিথ্যে মামলা দিয়ে তাকে জেলে পাঠায় ৷ এবং ইউনুসের সাথে তার কোন ধরণের সম্পর্ক নেই ৷ তবে ইউনুস তার নাম ব্যাবহার করে বলে নানান জনের মুখে শুনেছেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন ৷

ইউনুস ইয়াবা ব্যাবসার সাথে জড়িত কিনা এমন প্রশ্ন করলে নূরবক্স বলেন, হ্যাঁ সে ইয়াবা ব্যাবসার সাথে সরাসরি জড়িত ৷ যেখানে যেয়ে আমার স্বাক্ষী দেওয়া প্রয়োজন সেখানে যেয়ে আমি স্বাক্ষী দিব ৷ তাছাড়া ইউনুসকে নিয়ে পূর্বে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয় তা শতভাগ সত্যি ৷
তবে আমি ইয়াবা ব্যাবসার সাথে জড়িত নয় ৷ তা পুরোপুরি সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করেন ৷