মিছবাহ উদ্দীন আরজু::

বর্তমানে অত্যান্ত দু:খজনক একটি বাস্তবতা হলো, এই শবে বরাতকে কেন্দ্র করে এতদিন কিছু লোক বাড়াবাড়ির শিকার ছিলো; তারা বিশেষ পদ্ধতির নামায আবিস্কার করেছিলো।

যেমন দু’রাকাত করে চার রাকাত নামায পড়তে হবে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহার পর পঞ্চাশ বার সূরা ইখলাস পড়তে হবে, নামায শেষে একশত বার দরূদ পাঠ করে মুনাজাত করতে হবে।

এভাবে করতে পারলে পঞ্চাশ বৎসরের গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। এরকম বিভিন্ন প্রকারের ভিত্তিহীন নামাযের পাশাপাশি নানান ধরণের কুসংস্কার আমাদের সমাজে প্রচলিত ছিল। এসকল কুসংস্কার এখনোও দূর হয়নি ।

অর্ধ শা’বানের রাতের বিশেষ পদ্ধতির ভিত্তিহীন নামাযের উৎপত্তি ৪৪৮ হিজরীতে।  মুহাদ্দিসীনে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে শবে বরাতে বিশেষ পদ্ধতির নামায যেমন এতো রাকাত পড়তে হবে, প্রতি রাকাতে সূরা এখলাছ এতো বার পড়তে হবে, এধরণের বিশেষ পদ্ধতির কোন নামায নেই। এসংক্রান্ত সকল হাদীস সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এগুলো জাল, এগুলোর কোন ভিত্তি নেই।

তারতুশী (রহ.) তাঁর কিতাব ‘মুখতাসারুল হাওয়াদিছি ওয়াল বিদা’-এ তিনি বলেছেন- ‘‘আবু মহাম্মদ মাকদিসী আমাকে জানিয়েছেন যে, এই ‘সালাতুর রাগাইব’ যা রজব এবং শা’বানে পড়া হয় তা ‘বাইতুল মুকাদ্দাসে’ ছিল না ।

সর্বপ্রথম এটি চালু হয় ৪৪৮ হিজরির শরুর দিকে। ‘ইবনু আবিল হামরা’ নামে পরিচিত ‘নাবুলুস’ এর এক ব্যক্তি বাইতুল মুকাদ্দাসে আমাদের কাছে আসে। সে সুন্দর তেলাওয়াত করতে পারত। অর্ধ শা’বানের রাতে ‘মসজিদে আকসা’য় সে নামায পড়ল।

তার পিছনে আরেকজন তাহরিমা বাঁধল এরপর তৃতীয় আরেকজন এরপর চতুর্থ আরেকজন এভাবে নামায শেষ করতে করতে দেখা গেল অনেক লোকের জামাত। পরবর্তী বছর আবার আসল এবং তার সাথে অনেক লোক নামায পড়ল একসময় এই নামাযটি মসজিদে ছড়িয়ে পড়ল।

এমনকি মসজিদে আকসাসহ মানুষের ঘর-বাড়িতেও নামাজটি প্রচার লাভ করল। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এটি এমনভাবে স্থির হয়ে গেল যেন এটিই নিয়ম ! (মুখতাসারুল হাওয়াদিছি ওয়াল বিদা, তারতুশী, পৃ. ৮৬-৮৭) আর দলবদ্ধ হয়ে মসজিদে গিয়ে এ রাতের ইবাদত শুরু হয়েছে ৪৪৮ হিজরীরও আগে । কেননা ফাকিহী রহ. (২১৭-২৭৫হি:) ‘আখবারে মাক্বা’ গ্রন্থে (৩/৮৪) আহলে মাক্কার আমল এই বলে উল্লেখ করেছেন- ‘‘অতীত কাল থেকে আজ পর্যন্ত আহলে মক্কার আমল চলে আসছে যে, অর্ধ শা’বানের রাতে সাধারণ নর-নারী মসজিদে বের হতো অতঃপর নামায পড়তো, তাওয়াফ করতো এবং পুরো রাত ইবাদত করে কাটাতো।

সকাল পর্যন্ত মসজিদে হারামে কোরআন তেলাওয়াত এবং কোনআন খতম করতো আর নামায পড়তো। যারা নামায পড়তো প্রতি রাকাআতে ‘আল হামদু’ পড়তো এবং দশবার ‘কুল হুয়াল্লাহ’ পড়তো। আর যমযমের পানি পান করতো এবং  তা দিয়ে গোসল করত আর অসুস্থদের জন্য তা জমা করে রাখতো। উদ্দেশ্য এ রাতের বরকত অর্জন করা।’’ (আখবারে মাক্বা: ৩/৮৪) বুঝা গেল, অর্ধ শা’বানের রাতে দলবদ্ধ ইবাদতের এই বিদআতের সূচনা ৪৪৮ হিজরীরও আগে হয়েছে।

কেননা ফাকিহী রহ. আনুমানিক ২৭৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন সুতরাং বুঝা গেল আহলে মাক্কা ২৭৫ হিজরীর আগেই এই ভিত্তিহীন নামায এবং পুরুষ-মহিলা মসজিদে গিয়ে দলবদ্ধ ইবাদতে অভ্যস্ত ছিল।

যাই হোক, আহলে মাক্কা যেভাবে এই রাতটি উদযাপন করত বা বাইতুল মুকাদ্দাসে যেভাবে জড়ো হয়ে বিশেষ পদ্ধতির নামায পড়া হতো এটি তো শরীয়ত-স্বীকৃত অর্ধ শা’বানের আমল নয়।

এছাড়া তখন শামের কিছু আলেম মসজিদে জড়ো হয়ে ইবাদতের পক্ষে মত দিয়েছিলেন এবং নিজেরাও এভাবে ইবাদত করা শুরু করেছিলেন তখন অন্যান্য আলেমগণ তাদের বিরোধিতা করেন এবং জড়ো না হয়ে একাকী ইবাদতের পক্ষে মত দেন। শামের প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুহাদ্দিস আওযায়ী (রহ.) (১৫৭ হি.) মতও তাই ছিল।

বিষয়টি ইবনে হাজার হাইতামী রহ. (৯০৯-৯৭৪ হি.) এর বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি শামের ঐ সকল ফুকীহদের শবে বরাত উদযাপনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এই বিশেষ পদ্ধতিতে জড়ো হওয়া এমন নবসৃষ্ট বিষয় যা শরীয়তে ছিল না। সুতরাং যেই এমন কাজ করবে তার এই কাজ নবীজীর হাদীস অনুযায়ী প্রত্যাখ্যাত হবে।

কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি শরীয়তে এমন জিনিস সৃষ্টি করবে যা এতে ছিল না তা প্রত্যাখ্যাত হবে। তিনি বলেন, সম্ভবত তাদেরকে এই কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে যে সকল জাল হাদীস বর্ণিত হয়েছে এগুলো। তারা এগুলো জাল মনে করেন নি তাই এগুলোর উপর আমল করেছেন আর অসংখ্য মানুষ তাদের অনুসরণ করেছে।

পরবর্তীতে যখন একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, এগুলো (এ সকল হাদীস) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যারোপ করা হয়েছে তখন উলামাগণ এগুলো পরিত্যাগ করলেন এবং কঠিনভাবে প্রত্যখ্যান করলেন আর নিন্দাজ্ঞাপন করলেন।’’ (আল ঈযাহ ওয়াল বায়ান, ইবনে হাজার হাইতামী [মাখতুত]

তাই একথা বুঝা গেল যে, এই রাতে বিশেষ পদ্ধতির নামায এবং এর জন্য দলবদ্ধ হয়ে তা আদায় করা সম্পূর্ণ বেদয়াত।

মিজবাহ উদ্দীন আরজু
শিক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মী