ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

(নুরুল আলম হেলালি)

করোনার থাবায় যখন বিশ্বের পরাশক্তি সমূহ একে একে ধরাশায়ী হচ্ছে তখন এর আলোড়নটা বাংলাদেশের মাটিকেও কম্পন দিতে শুরু করে ৷ ইতালী, স্পেন ও আমেরিকার লাশের সারি দেখে যখন এদেশের মানুষ ভীত হয়ে পড়ে তখনই সরকার বাহাদুর সারা দেশের সকল স্কুল-কলেজ ও যাবতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করার পাশাপাশি সকল অফিস আদালতও বন্ধ ঘোষনা করে ৷ তখন চারদিকে একটা ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয় ৷

এই ভীতিকর পরিস্থিতেও সেবা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্যখাত ও প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয় ৷ নির্দেশনা সত্ত্বেও অনেক হাসপাতাল এবং ডাক্তারগণ মৃত্যুর ভয়ে রোগী দেখা বন্ধ করে দেয় ৷ এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার সেবা প্রদানকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে ৷ সেবা দিতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করলে ৫০ লক্ষ এবং আক্রান্ত হলে গ্রেড অনুযায়ী ১০থেকে সর্বনিম্ন ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ৷ ফলে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত চাকুরীজীবিদের মাঝে একটু কর্ম চঞ্চলতা ফিরে আসে এবং কয়েকজন ডাক্তার আক্রান্ত হয়ে মারাও যায় ৷ কিন্তু বেশীর ভাগ সিম্পটম না থাকায় ভাল হয়ে যায় ৷

যখন কোন সিম্পটম ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ এবং পুলিশ বিভাগের চাকুরীজীবিগণ আক্রান্ত হয়ে ভাল হয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশে মৃত্যুর হারও কম দেখা যাচ্ছে তখন সরকারী সকল ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা/কর্মচারিদের মাঝে করোনা পজেটিভ হওয়ার একধরণের অশুভ প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেল ! কে আগে স্যাম্পল দিবে এবং বন্ধ অফিসকে খোলা ঘোষণা করবে সে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হল ৷ সকল কিছু বন্ধ থাকলেও ফিল্ডে বা অফিসে বসে সেলফি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ভারী করতে লাগল ! কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে বলতে লাগল “করোনা আক্রান্তদের সেবায় মগ্ন আছি” !! অনেকে নির্দিষ্ট সামাজিক দুরুত্বকে অবহেলা ও মাস্ক সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করে ডেম কেয়ার চলাফেরা শুরু করে দিল ৷

আবার কেউ কেউ সামান্য কাশিঁ কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হলেই নমুনা দেয়ার জন্য চলে আসতে লাগল ৷ অনেকে সপ্তাহে তিন থেকে চার বার স্যাম্পল দিতে লাগল ৷ ফলে নমুনা সংগ্রকারীগণও একধরণে বিপদে পড়ে গেল ৷ একজন অপরজনকে ফোন দিয়ে বলতে লাগল, ভাই আল্লাহর রহমতে আমিও পজেটিভ সাথে তোমার ভাবীও পজেটিভ !! আবার অনেকে খবর শুনার সাথে সাথে আলহামদুলিল্লাহ পড়তে শুনা গেল ৷ অনেকে পজেটিভ হতে না পেরে খুবই আফসোস ও হীনমন্যতায় ভোগতে শুরু করে ৷ এই যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগীতা ও প্রবণতা আমাদের মাঝে শুরু হয়েছে, এর শেষ কোথায় তা কি আমরা জানি ? আমরা যে পুরো জাতী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে আছি তা কি আমাদের ধারণা আছে ?

একটু চিন্তা করেন তু এই মহামারিতে দেশের ব্যবসা বানিজ্য সব বন্ধ ৷ সাধারণ মানুষগণ দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার জন্য নিত্য সংগ্রাম করছে, অথবা ত্রাণদাতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, সেখানে আমি আপনি সরকারী বেতন খেয়ে খেয়ে কতই আরামে আছি ! স্বাস্থ্যখাতে যারা আছে তারা না হয় সেবা দিচ্ছে ৷ কিন্তু তারাও কি বলতে পারবে সঠিক নিয়মে সেবাটা দিচ্ছে ? আগে যেখানে ৮ঘন্টা ডিউটি করত এখন তাও করছেনা ! ৭দিন ডিউটি করে ১৪ দিন ছুটি !!! বিকল্প যাদের নেই তারা ছাড়া সবাই আরামে আছে ৷ এই জন্য সরকারের সুনাম করা দরকার এবং দ্বিগুন উৎসাহে মানুষের সেবা করা দরকার ৷ কারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়েই তু আমাদের বেতন তথা ভরণপোষন করা হচ্ছে, তা নয় কি ?

তাহলে কিসের প্রোণোদনার জন্য আমরা করোনা পজেটিভ হওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছি ? আমাদের বিবেক কি একেবারেই পচেঁ গেছে ? আমরা কি মানসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছি ? এই মহামারিতে আমাদের উচিত ছিল যতটুকু পারি সরকারী দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা ৷ মানুষের সেবার মাধ্যমে নিজেদেরকে সেবাদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা ৷ গরীব, অসহায় ও দুস্থদের মাঝে নিজের খাবার ভাগ করে দেওয়া ৷ এই কঠিন অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে সহায়তা করা ! আপনি মরে গেলে সরকার তু আপনার পরিবারের পাশে আছে তাই না ? সাথে পাবেন জনগণকেও ৷ কিন্তু তা না করে আপনারা আছেন আপনাদের ধান্ধায় ! আরে ভাই এত টাকা দিয়ে কি করবেন ? আপনি মরে গেলে এই টাকা তু আপনার সাথে যাবেনা ! আপনার লাশ দাফন করার মানুষ তু পাবেন না ! বুকে হাত দিয়ে বলেন তু আপনার উপার্জিত টাকা গুলি হালাল হচ্ছে কিনা ?

এই মহামারিতে সেবা দেওয়ার ভাগ্য কয়জনের আছে ? এই সুযোগ তু বার বার আসেনা ! কাজ করার স্কুফ না থাকলে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন ৷ স্বেচ্ছাসেবী হোন ৷ জাতী আপনাকে মনে রাখবে ৷ সরকারকে বলব প্রণোদনাটা বাতিল করুন ৷ যারা ডিউটি করতেছে তাদের এক মাস কিংবা দু মাসের বেতন বেশী অথবা একটা ইনক্রিমেন্ট বাড়িয়ে দিতে পারেন ৷ আর যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদের পরিবারকে আজীবন নিরাপত্তা দিন ৷ জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষিত করুন ! আর যারা ছুটিকালীন এদিক সেদিক ছুটোছুটি করে করোনা পজেটিভ হয়েছে তাদের বিরোদ্ধে ব্যবস্থা নিন ৷ কৈফিয়ত তলব করুন, কেন ঘর থেকে বের হয়েছে ? এই আদেশটা জারী হলে অনেক কাজ কমে যাবে ৷ ল্যাবে ধান্ধাবাজি বন্ধ হবে ৷ টাকার বিনিময়ে নেগেটিভ/ পজেটিভ রিপোর্ট আসবেনা ! অন্তত কিছু কীটের অপচয় রোধ হবে ৷

বিঃ দ্রঃ- আমি প্রোণোদনার পক্ষে নই ৷ আমি আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছি প্রোণোদনা দিলেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করে দেব ৷

লেখক: নুরুল আলম হেলালী
টেকনিশিয়ান – মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।