অনলাইন ডেস্কঃ-

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর এ ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়েছে৷ ওসি প্রদীপ কুমার দাস এবং এসআই লিয়াকতসহ সাত জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে৷ তবে বিভিন্ন ঘটনার সূত্র ধরে কক্সবাজারের এসপি এ বি এম মাসুদ হোসেনের নামও এখন আলোচিত৷

সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনায় টেকনাফ থানা পুলিশ নিজেই একটি হত্যা মামলা করেছে৷ যাতে সিনহা এবং তার সাথে থাকা সিফাতের ওপর পারস্পরিক দায় চাপানো হয়েছে৷ দ্বিতীয় মামলাটি পুলিশ করেছে মাদক এবং অস্ত্র আইনে৷

তৃতীয় মামলাটি সিনহার পরিবারের পক্ষ থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাস এবং এসআই লিয়াকতসহ নয় জনকে আসামি করে আদালতের মাধ্যমে (হত্যা মামলা) দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাটিও আদালতের নির্দেশে থানায় রেকর্ড হয়েছে৷ তদন্ত করছে র‌্যাব। ওসি এবং এসআইসহ সাত পুলিশকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তবে বাকি দুইজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি৷ ফলে তারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

কক্সবাজারের এসপির নাম যে কারণে আলোচনায়

গত কয়েকদিনে ফাঁস হয়ে যাওয়া কয়েকটি টেলিফোন কথোপকথনের অডিও প্রকাশিত হয়েছে৷ আর সেই কথোপকথনে কক্সকাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেনও রয়েছেন৷

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সারোয়ার কাবেরী দাবি করেন, ‘পুরো ঘটনার সাথে এসপি নিজেও সম্পৃক্ত৷ কারণ যে টেলিফোন রেকর্ড প্রকাশ হয়েছে তাতে এসপি সাহেব ওসিকে ঘটনা ঘটাতে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা স্পষ্ট৷ আবার এসআই লিয়াকতকে তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন যে, তোমাকে গুলি করেছে তা তোমার গায়ে লাগেনি৷ আত্মরক্ষার্থে তুমি যে গুলি করেছ তা তার গায়ে লেগেছে৷’

তিনি বলেন, ‘গত ২২ মাস ধরে ওসি প্রদীপ আরো অনেক অপকর্ম করেছেন যার প্রতিকার আমরা এসপি সাহেবের কাছে চেয়েছি৷ কিন্তু তিনি ওসি প্রদীপের পক্ষ নিয়েছেন।’

তাঁর মতে, ‘সিনহা হয়তো পুলিশের মাদক ও ক্রসফায়ার বাণিজ্যের কোনো তথ্য জানতে পেরেছিল৷ যা ওসি সাহেবও জানতে পারেন৷ সে কারণেই সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে৷’

এ ঘটনায় যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে ‘ক্রসফায়ার নাটক’ কিভাবে সাজানো হয় তা পরিষ্কার হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা৷ শুধু তাই নয় এটা করতে পুলিশকে এক ধরনের অনুমতি যে দেয়া আছে তাও বোঝা যায়৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘সিনহা হত্যা পরিকল্পনায় বা হত্যার পর নাটক সাজাতে আরো কেউ জড়িত থাকতে পারেন৷ তারা আরো উপরের কর্মকর্তা হতে পারেন৷ তাই বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত হওয়া দরকার৷’ পুলিশ যদি এভাবে মানুষ হত্যা করে তাহলে দেশের নাগরিকরা যাবেন কোথায়, প্রশ্ন করেন তিনি৷

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, ‘আমি তো নিয়মিত টেকনাফ থানায় যাই৷ আমি দেখেছি ওসি প্রদীপ এসপি সাহেবের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করত না৷ সব সময়ই টেলিফোনে পরামর্শ করতো৷ তাই এত বড় ঘটনা সে এসপি সাহেবের সাথে পরামর্শ ছাড়া করেছে বলে আমার মনে হয় না৷’

পুলিশ সুপার যা বলছেন

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ হোসেন বলেন, ‘এই ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়েছে৷ পুলিশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে দুইটি৷ আর সিনহা সাহেবের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি৷ সবগুলো মামলারই এখন তদন্ত চলছে৷ তদন্ত শেষেই সব কিছু পরিস্কার হবে৷’

টেলিফোন রেকর্ড এবং সিনহা হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত চলছে৷ একটা উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে৷ তাই এই অবস্থায় আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না৷ মন্তব্য করলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে৷ আমার যে বক্তব্য তা আমি তদন্ত কমিটির কাছেই জানাব৷’

তদন্ত কতদূর এগোলো?

সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ আরো কিছু কাজ করেছে৷ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাথেও কথা বলেছে৷ ওসিসহ গ্রেপ্তার আসামি, ঘটনার সময়ে মেজর সিনহার সঙ্গে যারা ছিলেন, তার পরিবারের সদস্যরা এবং কক্সবাজার পুলিশ সুপারেরও তারা বক্তব্য নিবে৷ কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা তদন্তে প্রয়োজনীয় কোনো দিকই বাদ দিচ্ছি না৷ আর স্বাধীনভাবেই তদন্ত করছি৷ পুলিশসহ সব পক্ষই আমাদের সহযোগিতা করছে৷’

গত সোমবার থেকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে৷

সূত্র : ডি ডাব্লিউ