পাঠক কলাম:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার সফল রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম সাহসিকতা, বিপুল আত্মবিশ্বাস, সততা ও দৃঢ়তায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত পদ্মা সেতু আগামীকাল ২৫ জুন ২০২২ উদ্বোধন করবেন। বাংলার জনগণ চেয়েছিল এই সেতুর নাম তাঁর (শেখ হাসিনা)  নামে করার জন্য। কিন্তু তিনি তাতে সায় দেননি। যিনি ইতিহাস রচনা করেন, তার নাম ফলকে নয়, তাঁর নাম থাকবে মানুষের অন্তরে। ‘শেখ হাসিনা’ বাংলার মানুষের হৃদয়ে চির অম্লান থাকবেন।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে ২০০০ সালে প্রাক সম্ভাব্যতা পরিচালনা করা হয় এবং এর ভিত্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই তারিখে মাওয়া অবস্থানে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে ১০,১৬১.৭৫ কোটি টাকা (দশ হাজার একশ একষট্টি কোটি পঁচাত্তর লক্ষ টাকা) প্রাক্কলিত ব্যয় সংবলিত ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ২৪ আগস্ট ২০০৭ তারিখের একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল ৫.৫৮ কিলোমিটার। সেখানে তিনটি স্প্যান নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্সের কথা উল্লেখ ছিল। ডিটেইলড ডিজাইনের পর ডিপিপি সংশোধন করা হবে, তাও প্রথম ডিপিপিতে উল্লেখ ছিল। পরে বিস্তারিত ডিজাইন অনুযায়ী সেতুর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬.১৫ কিলোমিটার (ভায়াডাক্টসহ ৯.৮৩ কিলোমিটার) এক লেভেলের পরিবর্তে দুই লেভেলের সেতু অর্থাৎ সড়ক এবং রেলের উভয় সুবিধার জন্য দ্বিতল সেতু নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ৩টি স্প্যানের স্থলে ৩৭টি স্প্যানের নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য উচ্চতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের প্রভিশন রাখা, অপটিক্যাল লাইন পরিবহনের সুবিধা, সংযোগ সড়কের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমিকম্পের সহনীয়তা মাথায় রেখে সিসমিক লোডিং বৃদ্ধিকরণ, ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে ২০,৫০৭.২০ কোটি টাকা (বিশ হাজার পাঁচশ সাত কোটি বিশ লাখ টাকা) ব্যয়ে সংশোধিত ডিপিপি ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারির একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।২০১৬ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ২৮,৭৯৩.৩৯ কোটি টাকা (আটাশ হাজার সাতশ তিরানব্বই কোটি ঊনচল্লিশ লক্ষ টাকা) যা ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন করা হয়।

পদ্মা সেতু হচ্ছে আমাদের আত্মমর্যাদা, দৃঢ়তা ও অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার প্রতীক। সব অসত্য ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমাদের পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে, তাও নিজেদের টাকায় বাইরের কারও দয়ায় নয়।

বিপুল সাহস নিয়ে মনের মধ্যে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি জনগণের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন- তার শতভাগ উপলব্ধি হয়তো কখনই আমরা করতে পারব না। যড়যন্ত্রকারীরা পদ্মা সেতু নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য, উপদেষ্টা এবং সচিবকে। কিন্তু সব অসৎ ও অশুভ-উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলার জনগণকে পাশে নিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, বাংলাদেশকে জয়ী করেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় সব চক্রান্তের অবসান হয়। নেতৃত্বের অবিচল দৃঢ়তার কাছে বিশ্বব্যাংকসহ সব দাতাগোষ্ঠীর মোড়লিপনা এবং মিথ্যা অহমিকার পরাজয় ঘটে।

পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আকস্মিকভাবে মিথ্যা অপবাদ, গুজব, অপপ্রচারের ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালের ২৯ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘দুর্নীতির চেষ্টার কল্পিত অভিযোগ’ এনে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয়।

তখন বঙ্গবন্ধু-কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন কোনো দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না। অতঃপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৯ জুলাই ২০১২ তারিখের সভায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। একই সঙ্গে ঋণচুক্তি বাতিল করা সংক্রান্ত তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিশ্বব্যাংককে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তী সময় দেখা যায়, বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি, এমনকি ২০১৭ সালে কানাডার একটি আদালতের রায়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলা হয়। বিশ্বব্যাংক এবং দাতাগোষ্ঠীর ঋণসহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির কাজ শুরু করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জাতির গৌরবের এক ইতিহাস রচনা করেছেন।

সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সচেতন মহলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে খরচ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যখন তুলে ধরা হচ্ছে, তখন আবার কেউ কেউ বলা শুরু করছে টোল আদায়ের হারটা বেশি হয়ে গেছে। টোলের হার নির্ধারণের যৌক্তিকতার প্রসঙ্গ টেনে ১৮ জুন ২০২২ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক জাতীয় সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, তিনি একজন ট্রাক চালকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছেন, পদ্মা সেতুতে মাঝারি ট্রাকের (৫ থেকে ৮ টন) জন্য টোল ২৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও (পূর্ববর্তী ১৮০০ টাকা) ফেরিতে তোলা বাবদ ২০০ টাকা, দুই-তিন দিন আটকা পড়লে ট্রাকে থাকা দুজনের খরচ বাবদ আরও ২ হাজার বা তার বেশি টাকা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ তাদের হিসাব মতে, ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হতো। এ ছাড়া চার থেকে পাঁচ দিন সময় নষ্ট হতো। ঘাটে ২/৩ কিলোমিটারের লাইন যে অসহনীয় তা ভুক্তভোগীরাই অনুমান করতে পারবেন। এখন একই ট্রাক চার-পাঁচ দিনে ২-৩টা ট্রিপ দিতে পারবে। তাই যারা সমালোচনা করছেন, তা যথার্থ নয়।

অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করলে বলা যায়, পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতিকে সচল ও অধিকতর চাঙ্গা করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। এই সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ ও পণ্য পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। পদ্মা সেতু ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগসূত্র স্থাপন করবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চেহারা বদলে দেবে পদ্মা সেতু।

দেশের অন্যতম গুরূত্বপূর্ণ দুটি নৌবন্দরের একটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় অবস্থিত। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর নতুন উদ্যমে চালু থাকবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ ঢাকা থেকে যশোর হয়ে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যাত্রীসাধারণ ভ্রমণ এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবেন। পদ্মা নদীর উভয় পারে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুসারে নদীর দুই পারে ৭টি মডেল টাউন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের অবস্থা তেমন উন্নত ও যুগোপযোগী নয়। এই দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিপণ্য উৎপাদন হয় বটে, কিন্তু যোগাযোগ সমস্যার কারণে নিঃসন্দেহে দরিদ্র কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। পাশাপাশি এ সেতুকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখবে।

পদ্মা সেতু ও সংযোগ সড়ক এশিয়ান হাইওয়ে রুট এএইচ-১-এর অংশ হওয়ায় তা যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে এশিয়ান হাইওয়ে এবং এশিয়ান রেলওয়ের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এই পথে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে। খুলনা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিমি, কিন্তু কখনো কখনো সময় লাগে ৮/১০ ঘণ্টা, পদ্মা সেতু দিয়ে সেই ভ্রমণ সময় কমে আসবে মাত্র ৪ ঘণ্টায়। পদ্মা সেতু ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামাল সরবরাহ ও শিল্পায়ন সহজতর করতে সহায়তা করবে। ফলে গড়ে উঠবে বড় বড় শিল্প ও শিল্পাঞ্চল। চিংড়ি, কাপড় ও পাটজাত পণ্যের ব্যবসার আরও প্রসার ঘটবে। সেতুর পাশে গড়ে উঠবে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল-মোটেল এবং বেসরকারি শিল্প শহর।

দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, মাওয়া ও জাজিরায় পুরনো-নতুন রিসোর্টসহ পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সততা, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার কাছে পরাজিত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। সারাবিশ্বকে শেখ হাসিনা আবারও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর বাণীকে ধারণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন- ‘বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি এবং পারবেও না কোনোদিন।’ এই জয় বাংলার মানুষের। এই জয় বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে আবারও চিনিয়েছেন- বাঙালি মাথা নোয়াবার নয়।

জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
জয়তু শেখ হাসিনা

তথ্য সংগ্রহ ও লিখিতে:
মোঃ বাহাউদ্দিন বাহার
সাবেক ছাত্রনেতা ও উন্নয়ন কর্মী
baharcou2009@gmail.com